আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্ন দেখেছি যে তুমি তোমার বাস্তবতা হারিয়ে ফেলেছো... আমি তোমাকে এত বেশি স্বপ্ন দেখেছি যে হয়তো আমার পক্ষে আর জাগাই সম্ভব হবে না...
People,dont you know I'm only human,I have faults like any one...Life has its problems and I get more than my share...
একটি ছেলে ধোঁয়ার স্নানে সিক্ত হয় তোমার কথা ভেবে
বুঝতে পার কি তুমি?
ছাই এর পর ছাই জমে যায় হৃদয়ে
অবসন্ন হয়ে আসে মন, দীর্ঘক্ষণ
ক্লেদাক্ত দিনের ব্যস্ততা শেষে
নিশ্চুপ নিশীথে একা একা তারা গুলোর দিকে তাকিয়ে রই
অপেক্ষার প্রহর গুণে যাই
হয়ত তুমি আসবেনা ।।
তবুও তোমারই শুধু তোমারই প্রতিক্ষায় এ দীর্ঘ পথ চেয়ে থাকি
অশ্রু পড়েনা এ দু’ চোখ দিয়ে
কিন্তু হৃদয়ের অশ্রু ক্ষরণ যে আরও অনেক বিষময় মোনা
এ কথা কি তুমি জান না?
ভালোবাসা যদি বিশ্বাসের আরেকটি রূপ হয়, তবে তুমি আমায় ভালোবাসনি। ভালোবাসা যদি হয় নির্ভরতার প্রতিক, তবে তুমি সেখানে একে দিয়েছ এক দারুন কষাঘাতের চিহ্ন। তোমায় ভালোবেসেছিলাম আশ্রয়ের খোঁজে, আমার অতীত জীবনের সব গ্লানি থেকে যেখানে মুক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু তুমি কি সত্যিই আমায় ভালোবেসেছিলে? নাকি মোহের বশে কিছুদিন আমায় চুম্বনে সিক্ত করে পরে ছুড়ে ফেলে দিলে আস্তাকুড়ে, যেন ওটাই আমার যোগ্যতম স্থান। তোমাকে আমি কি দেইনি বল? বিশ্ববিধাতার পর যদি আর কারো কাছে নিজেকে প্রস্ফুটিত অবস্থায় সমর্পন করেছিলাম সে তো তুমিই। এখন আর আমার বিধাতার ওপর আশ্বাস নেই, তার কাছে রাতের পর রাত প্রার্থনা করেছি যেন তোমায় নিয়ে বাধা শতশত স্বপ্ন সত্যি হয়, কিন্তু সবই প্রবঞ্চনা। আমি যে তোমায় ছাড়া কিছুই ভাবতে পারিনা এখনও। আমার সম্পুর্ণ জগতটাই তো তোমাকে নিয়ে গড়ে ওঠা, সেখানে তো আর কারো প্রবেশের অনুমতি নেই। তাই তোমার কাছ থেকে বিদায় নেয়া মানে এই নিষ্ঠুর সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া। আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু যাবার আগে তোমার কাছে শেষ মিনতী, তোমার কারণে আমার মত পরিণতি যেন না হয় তোমার…
নুতন পাওয়া ভালোবাসার ।
হে বিশ্ব, আমি তোমায় ছেড়ে চলে যাচ্ছ কারণ আমি ক্লান্ত, তুমি আমায় অনেক কিছু দিয়েছিলে। কিন্তু আমি তোমায় কিছুই দিয়ে যেতে পারলাম না কিছু এলোমেলো স্মৃতি আর এই নশ্বর দেহ ছাড়া, ক্ষমা কোরো আমায়।
[ প্রিয় পাঠক-পাঠিকা গণ দয়া করিয়া ইহা ভাবিবেন না যে আমি বা কেহ এই পথে ধাবিত হইতেছে। ইহা নিতান্তই এক অস্থির মস্তিস্কের কল্পনা প্রসুত। জীবিত বা আত্মহত্যায় মৃত কাহারও সহিত ইহা সম্পর্ক যুক্ত নহে।]
ব্যক্তিগত ভাবে আমি তথাকথিত সেক্যুলারিজমে বিশ্বাসী নই। সেক্যুলারিজমের শাব্দিক অর্থ প্রদান করা হয়েছে ‘Exclusion of Religion from Public Affair’ এবং ‘Rejection of Religion’ (Microsoft Encarta Dictionary). কিন্তু আমরা প্রাচীন বাংলার ইতিহাস থেকে শুরু করে আধুনিক ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব বাংলায় কখনোই কোন রাজ্যে ধর্মচ্যুতির ব্যাপার ঘটেনি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ধর্ম ছিল একটি অপরিহার্য অঙ্গ। গুপ্ত সম্রাজ্যে শৈব ও বৈষ্ণব ধর্ম হিন্দু ধর্মের কাছাকাছি এসে পড়ে আর বৌদ্ধ ধর্ম তার আধ্মাতিক নাস্তিক্যবাদ পরিহার করে ভক্তি আন্দোলনের এতটা কাছে চলে আসে যে বুদ্ধদেব বিষ্ণুর একজন অবতার হিসেবে স্বীকৃতি পান। ক্লাসিক্যাল যুগের শেষ ধাপে খৃষ্টান ইউরোপের ভীতি ছিল এথিস্ট আতিলা-দ্যা-হানকে নিয়ে, মধ্যযুগে মুর ও অটোম্যানদের নিয়ে। কিন্তু বাংলায় রাজায় রাজায় যুদ্ধ হত, ধর্মের প্রভাব ছিল খুব সামান্যই। পাশ্চাত্য পন্ডিতদের ‘ধর্মই সকল সংঘাতের মূলে’ ধারনাকে ভূল ও অসার প্রমানিত করে যে শক্তির মাধ্যমে বাংলার সকল ধর্মের অধিবাসী মিলে-মিশে থাকত তাই হল বাঙ্গালী জাতির ধর্মীয় সহনশীলতা বা রিলিজিয়াস টলারেন্স যা পূর্বতন ব্লগে আলোচিত হয়েছে। এই রিলিজিয়াস টলারেন্স বাঙ্গালী জাতির নিজস্ব ডগমা, এটা কোন পাশ্চাত্য অনুকরন নয়। বস্তুত কম্যুনিজম,ক্যাপিটালিজম,এথিজম, সেক্যুলারিজম এমনকি ফান্ডামেন্টালিজম ও রিলিজিয়াস এক্সট্রিমিজমের জন্মস্থান ঐ পাশ্চাত্যে যারা নিজেদের মধ্যেকার শত বছরের দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে এসব মতবাদ রচিত করেছে। আজকালের বেশ কিছু বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবিরাও নিজেদের শক্তির উৎস ভূলে গিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকে ইগনোর করে পাশ্চাত্য সেক্যুলারিজম মতবাদ এই দেশে টেনে নিয়ে আসে। সেক্যুলারিজমের শাব্দিক অর্থ যাই হোক না কেন বাংলায় সেক্যুলারিস্ট ও এথিস্টদের নিয়ে একটা বিতর্ক আছে এবং বাংলাদেশে এই সেক্যুলারিস্ট ও এথিস্টদের পার্থক্য নিরুপন করাটা এতটা সহজ নয়। প্রাচীন বাংলায়-ও হয়ত সবাই ধার্মিক ছিলনা, কিন্তু তারা ঈশ্বরে অবিশ্বাস অথবা সমাজ ও দৈনন্দিন জীবন থেকে ধর্মের প্রভাব কখনোই করেননি বা করতে চাননি। হাজার বছরের সে ধারা আজো অবধি অব্যাহত আছে। আর একারনেই কিছু বাংলায় নব্য এথিস্টের মৃত্যুর পরেও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালিত হয়, আর এটা ছিল জীবিত বা মৃত অবস্থায় তাদের পাশ্চাত্য মেকি বিশ্বাসের ওপর প্রচণ্ড আঘাত। যারা সেক্যুলারিজমে বিশ্বাস করে তারা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার মতন ধর্মীয় সহিষ্ণু রাষ্ট্র চায় নাকি ধর্মহীন রাষ্ট্র চায় এ নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই দন্দ রয়েছে। থাকবেইতো, কাকের কর্কশ ধ্বনি কি আর কোকিলের কণ্ঠে শোভা পায়? আমাদের নিজেদের মূলেই যখন টলারেন্স নামের এত বড় একটি উপাদান রয়েছে, তখন কি দরকার এই বিদেশী ইজমকে টেনে আনার?
আরেক ধরনের নিকৃষ্ট প্রজাতির গোষ্ঠি ধর্মীয় উগ্রতা বা এক্সট্রিমিজমে বিশ্বাসী। এসব অন্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠি পাশ্চাত্য মদদে ও সাহায্যে পুষ্ট হয়ে বাঙ্গালী জাতির শেকড়ে গিয়ে আঘাত করে। এদের লক্ষ্য হল বর্তমানের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্যযুগীয় ইউরোপের মতন এক ধর্মান্ধ ও অসহিষ্ণু রাষ্ট্র কায়েম করা। এরা ওহাবি আরবে সফলকাম হলেও বাংলায় নয়, কারন বাঙ্গালী অন্য ধাতুতে গড়া।
বাঙ্গালী জাতি তাদের নিজ নিজ ধর্মকে সম্পুর্ণ নিজেদের মত করে সাজিয়ে ফেলেছিল। আর এর ফলে ধর্মীয় সম্প্রীতির শান্তিপূর্ণ মিলন ঘটা সম্ভব হয়েছিল। যেমন, বাংলায় মুসলমানদের কাছে যিনি সত্যপীর বলে পরিচিত তিনিই হিন্দুদের কাছে সত্যনারায়ন এবং মুসলমানদের বদরপীরের ভক্তিবাদ হিন্দুদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। পারস্পরিক সহাবস্থান এতটা কাছাকাছি চলে এসেছিল যে হিন্দু ধর্মের সাধু ও মুসলমান ধর্মের দরবেশদের একই মানুষের ভিন্ন ভিন্ন রূপ বলে বিবেচিত হত। এসকল বিশ্বাস এখন বেশ স্থিমিত হয়ে আসলেও যখন পাকিস্তানিরা তাদের মডিফায়েড ধর্ম আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল তখনি গর্জে উঠেছিল বাঙ্গালী, হাজার বছর আগে বাঙ্গালীর যে রূপ দেখেছিল আর্যরা, দেখেছিল সম্রাট আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী, দেখেছিল ব্রিটিশরা সিপাহী বিপ্লবের সময়, এবার দেখল পাকিস্তানিরা ১৯৭১-এ।
হাজার বছরের ইতিহাসে বাংলায় যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রয়েছে তা এতটা ঠুনকো নয় যে কোন এক অবাঙ্গালীর ‘দ্বি জাতী তত্ত্বের’ ভিত্তিতে ভেঙ্গে যাবে। শাসন ক্ষমতার জন্য বা শাসক গোষ্ঠীর চক্রান্তে অনেক সময়ই বাংলাকে একাধিক ভাগ করা হয়েছে, কিন্তু তা কখনোই স্থায়ী হয় নাই। বাংলা এখনো তিন খন্ডে বিভক্ত, এটা আমাদেরই দায়িত্ব এক ইউনিফায়েড বাংলা সৃষ্টি করা, যা হবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর বৃহৎ এক শক্তি।
হাজার বছর ধরে চলে আসা বাঙ্গালী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্বভাবতই বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। কখন-ও বা কিছুটা ধর্মীয় উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেলেও সেটা ছিল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। ব্রাক্ষ্মাণ্য ধর্মের অনুসারী গুপ্ত রাজ্যে নব বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার, বৌদ্ধ পাল রাজ্যে বিপুল পরিমান ব্রাক্ষ্মণ মন্ত্রী, বেশিরভাগ সেন রাজাগণ-ও একই পথ অনুসরণ করেন। সুদীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন রাজার শাসনামলে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু প্রাকৃত, ব্রাক্ষ্মাণ্য, বৌদ্ধ, জৈন, ইসলাম একই সংস্কৃতির মিথস্কৃয়ায় এক মহান অন্তঃশক্তি এনে দিয়েছিল যার কারনে বাঙ্গালী তাদের জাতিগত বন্ধন সুদৃঢ় রাখে আর তা ছিল ধর্মীয় সহনশীলতা বা টলারেন্স। মূলত বাঙ্গালী জাতির মূলে রয়েছে রিলিজিয়াস টলারেন্স বিষয়টি। এজন্য দেখা যায়, ইউরোপ যখন অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল (মধ্যযুগীয় স্পেন ব্যতিত), তখন বাংলা ছিল বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী রাজ্য। একারনেই প্রাচীন যুগে মহামতি আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে মধ্যযুগে তিব্বতী, আফগান, তুর্কিদের ও প্রাক রেঁনেসার যুগে ইউরোপিয়দের নজর ছিল এইদিকে। মধ্যযুগে যখন মৌলবাদী ধর্মান্ধ সম্প্রদায় ক্রুসেড নামক রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছিল তখন বাংলায় তুর্কি-আফগানদের প্রবেশ ধর্মযোদ্ধা হিসেবে নয় বরঞ্চ তারা শাসক হিসেবে দেশ জয় করতে এসেছিল। পূর্বতন রাজাদের মতন মুসলমান শাসকরাও যথেষ্ট উদার ছিল, তা আগের ব্লগেই বিস্তারিত উল্লেখ আছে।
উপমহাদেশে খৃষ্ট ধর্মের প্রবক্তা ব্রিটিশ, এ ধরনের ভূল ধারনা আমাদের অনেকেরই আছে। প্রকৃতপক্ষে সম্রাট আকবর কর্তৃক হুগলীতে পার্তুগিজদের বসতি স্থাপনের অনুমতি পেলে রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় জেসুইটস ও অগাস্টিনিয়ানদের দ্বারা এদেশে খৃষ্ট ধর্ম প্রচার কার্য শুরু হয়। পার্তুগিজ ছাড়াও এদেশে ওলন্দাজ,দিনেমার,ব্রিটিশ,ফরাসী,আর্মেনীয় এমনকি আমেরিকানরা পর্যন্ত বানিজ্য ও ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্য এদেশে আসত। পরবর্তিতে হামার্দ জলদস্যুগণ চট্রগ্রামে আস্তানা গাড়ে আর দস্যুতাকালে অপহৃতদের খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। কিন্তু তাই বলে এদেশর খৃষ্ট ধর্মের বিকাশ দস্যুদলের মাধ্যমে এসেছে এটা মনে করার কোন কারন নেই। যশোরের রাজপুত্র নিজেই খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে এন্টনিও-ডি-রোজারিও নাম ধারন করেন ও বাংলায় খৃষ্ট ধর্ম বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই এটা বলা যায় বাকি সব ধর্মের মত খৃষ্ট ধর্মও এদেশীয় পরিমন্ডলে উদ্ভাসিত।
কিন্তু এই ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর সর্বপ্রথম বড় আঘাত আসে ব্রিটিশ শাসনামলে। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলমানেরা বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে মিশে গিয়েছিল, কিন্তু ইউরোপিয়দের ধ্যান-ধারনা ছিল শাসন ও শোষণ। এজন্য তারা এক ঘৃণ্য পথ বেছে নেয়, আর তা হল ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি। ব্রিটিশরা নিজেদের নব্য আর্য হিসেবে বিবেচনা করত, আর তাদের সাম্প্রদয়িক ঔদ্ধত্য এতখানি বৃদ্ধি পায় যে তারা ভাবতে শুরু করে ভারতীয়দের সভ্য করা তাদের এক মহান গুরু দয়িত্ব। কিন্তু ভারতবাসী বিদ্রোহ ঘোষনা করলে তারা তাদের ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি বাস্তবায়নের জন্য এদেশীয় কিছু দালাল তৈরি করে যাদের প্ররচোনায় এদেশে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এরফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা হিন্দু-মুসলমানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক তিক্ত ও হৃদয়বিদারক অবসান ঘটে এবং হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে গড়ে ওঠে পারস্পরিক অবিশ্বাস যা আজও বিরাজমান।
এতদিন সাম্প্রদায়িকতা ছিল ধর্মের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু পাকিস্থান সৃষ্টির পর বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালীদের মধ্যে শুরু হয় তিক্ততা। মূলত এসময় বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। আবার হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলে ইসলামের কপট ধ্বজ্জ্বাধারী পাকিস্তানীদের বিতারিত করে স্বাধীন হল বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলার সংবিধানে সকল জাতি-ধর্মগোষ্ঠীর লোকজনকে বাঙ্গালী বলে পরিচয় দেয়াকে পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতীরা চ্যালেঞ্জ করে এবং তারা নিজেদের বাংলাদেশী, কিন্তু জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচয়ের দাবী জানায়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সাম্প্রদায়িক বিবাদে উভয় পক্ষের বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়। বর্তমানে তাদের দাবী মেনে নিয়ে এক শান্তিচুক্তি এই বিবাদ মিমাংসা করতে সাহায্য করে। (চলবে...)
সেই সুদুর তপ্ত মরুভুমির বুকে আরব ব-দ্বীপে জন্ম নেয়া ইসলাম ধর্ম একশত বছরের মধ্যেই সম্পুর্ণ আরব, মেসপটেমিয়া, পারসিয়া থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা অতিক্রম করে স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। বিশ্বের ইতিহাসে আর কোন ধর্মই এত দ্রুত বিস্তার লাভ করেনাই। ধীরে ধীরে পারসিয়া থেকে ট্র্যান্সক্সিয়ানা, সিন্ধু থেকে সিসিলি, সমরখন্দ থেকে সেভিল, ককেশাস থেকে আফ্রিকা, অক্সাম থেকে আনাতোলিয়া, আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ইন্দোচীন,প্যাসিফিক থেকে আটলান্টিক সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের বাণী। ইসলাম এত দ্রুত কিভাবে ছড়িয়ে পড়ল সেটা নিয়ে পন্ডিত ও দার্শনিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইসলাম বিশারদদের মতে ইসলামের সুফিবাদ-ই এত দ্রুত ইসলাম সম্প্রসারনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। অপরদিকে অন্ধকার যুগের ইউরোপিয় পন্ডিতদের মতে ইসলাম সম্প্রসারিত হয়েছে তরবারি দ্বারা। অবশ্য এটা ঠিক, কোন অঞ্চল বা দেশ মুসলিম শাসক দ্বারা জয়ের পড়েই সেখানে সাধক ও সুফিরা নির্বিঘ্নে ইসলাম সম্প্রসারন করতে পেরেছে, তা না হলে এটা সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ মুসলমানদের দেশ জয় ও সুফিদের দ্বারা ইসলাম সম্প্রসারন পরস্পর ফ্যাক্টর রূপে কাজ করেছে। অবশ্য সবক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়, কারন ইন্দোচীনে মুসলিম শাসক দেশ জয় করেনি বরঞ্চ আরব বণিকদের মাধ্যমে সেখানে ইসলাম প্রচার হয়, ঠিক যেমনটি হয়েছিল তুর্কি দ্বারা বিজয়ের পূর্বে বাংলায়।
বাংলায় মুসলিম আধিপত্য বিস্তৃতি শুরু হয় ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজির বাংলা আক্রমনের মধ্যে দিয়ে। এরপর ইতিহাসের ধারা অনুযায়ী ক্ষমতার হাতবদল হতে থাকে। ১২০৫ খৃঃ থেকে শুরু করে ১৩৩৮ খৃঃ পর্যন্ত দিল্লির শাসনাধিনে খিলজি, ইলবারি ও করৌনাহ বংশ দ্বারা বাংলা শাসিত হয়েছিল। এরা তখন নিজেদের সিংহাসন ও প্রাসাদ রাজনীতি নিয়েই বেশি ব্যস্তছিল। ধর্ম নিয়ে তাদের তেমন একটা মাথা ব্যাথা ছিলনা, আশ পাশের হিন্দু রাজাদের থেকে মূল্যবান উপঢৌকন পেয়েই তারা খুশি ছিল। পরবর্তি শতাব্দী ছিল বাংলার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ দিল্লির অধিনতা অস্বীকার করে স্বাধীন বাংলা ঘোষনা করেন ও ইলিয়াস শাহ যা এতদিন বঙ্গ, গৌড়, রাঢ়, পুন্ড্র, সমতট,হরিকেল নামে পরিচিত ছিল তা ইন্ট্রিগ্রেট করে একক রাজ্যে পরিগণিত করেন যার নাম দেয়া হয় সালতানাত-ই-বাঙ্গালাহ এবং শাসক শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান ও সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ উপাধি গ্রহণ করেন।
এদেশে ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটে স্থল-জল উভয় পথে, স্থল পথে তুর্কি আক্রমন ও জলপথে আরব বণিকদের মাধ্যমে। তাই ধারনা করা হয় তুর্কি শাসনের পূর্বেই এদেশে আরবীয় বণিকরা ইসলাম প্রচার করা শুরু করেন আর তুর্কি বিজয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। ১৪১১-১৪ খৃঃ রাজা গণেশ ও শিহাবুদ্দিন, ইলিয়াস শাহ বংশের অবসান ঘটিয়ে বাংলার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। কিছুদিনের মধ্যেই রাজা গণেশ শিহাবুদ্দিনকে নিহত করেন ও রাজা হয়েই মুসলমান প্রজাদের ওপর দমন নীতি চালান। এমতাবস্থায় সুফি-সাধকগণ বাংলায় হস্তক্ষেপের জন্য জৈনপুরের সুলতানের নিকট আবেদন জানায়, এ প্রেক্ষিতে রাজা গণেশ ভীত হয়ে নিজ রাজত্ব রক্ষার জন্য পুত্র যদুকে সুফি নূর কুতুবে আলমের নিকট ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ নামে রাজ্য পরিচালনার ভার দেন। অচিরেই রাজা গণেশ জালালুদ্দিনকে আবার হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করান। কিন্তু জালালুদ্দিন তার পিতাকে পরাজিত করে পুনরায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ও রাজা গণেশ দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ মাদ্রাসা পুনঃনির্মান করেন। তিনি চায়না, হিরাত ও কায়রোর সুলতানদের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি বাংলায় ইসলাম প্রচারের জন্য বিশেষ ভুমিকা রাখেন। বিশেষ করে মোঙ্গল কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংসের পর উন্নত জীবিকার লক্ষ্যে প্রচুর পরিমানে সৈয়দ, ওলামা ও সুফি-সাধকের আগমন ঘটে বাংলায়। তারা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা লাভের কারনে তাদের আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য প্রচুর মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা গড়ে তোলেন। অধিকন্তু তিনি ছিলেন হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি সহিষ্ণু ও সহানুভূতিশীল। তার সময় সেনাপতি ছিল হিন্দু। এছাড়াও তিনি পন্ডিত ও ব্রাক্ষ্মনদের প্রচুর পৃষ্ঠপোশকতা প্রদান করেন। সে সময় হিন্দু রাজার মুসলমান সেনাপতি বা সুলতানদের হিন্দু মন্ত্রী, আমাত্য, রাজ কবি ছিল সাধারণ ঘটনা।
অনেকেরই ভূল ধারনা আছে বাংলায় ইসলাম দুরদেশ থেকে আসা এক ধর্ম যা বাঙ্গালী সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রকৃত পক্ষে বাংলায় ইসলাম প্রচার শুরু হয় এক প্রকৃত বাঙ্গালী শাসক দ্বারা, কোন তুর্কি বা আফগান দ্বারা নয়। আর তাই বাংলার মাটি-বাতাস সবকিছুকে আপন করে নিতে পেরেছিল এই ধর্ম যেমনটি করে নিয়েছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম। বস্তুত একমাত্র অধুনালুপ্ত জৈন ধর্ম ব্যাতিত আর কোন ধর্মকেই এদেশীয় বলা যাবেনা। হাজার বছর আগে পশ্চিম থেকে আসা আর্যদের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ঘটে যাওয়া ঘটনা, যুদ্ধকে আশ্রয় করে তারা গড়ে তুললো বস্তুর অতীত অতিন্দ্রীয় স্রষ্টা দর্শন যা পরে পরিনত হয় ব্রক্ষ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের ধর্মে। পরবর্তিতে মুসলমান বিজেতারা সিন্ধু নদের ওপারের জনগোষ্ঠীর নাম দেন হিন্দু। সেই থেকেই ব্রক্ষ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের ধর্ম হিন্দু ধর্ম নামে সুপরিচিতি ঘটে। এদিকে নেপাল সীমান্তবর্তী কপিলাবস্তুর রাজা ভগবান বুদ্ধের মতাদর্শের যে অংশটি বাংলায় প্রবেশ করে তা ছিল তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম বা বৌদ্ধ ধর্মের এক অধঃপতিত রূপ। বিশুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম থেকে এই তান্ত্রিকতায় রূপান্তরের কারনে বলা যায়, বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের এই রহস্যময় গুঢ় চর্চার ধারা একান্তই বাংলার। তাই বলা যেতে পারে বাংলার সংস্কৃতির দ্বারা ধর্ম প্রভাবিত হয়েছে বেশী যতটা না ধর্ম দ্বারা সংস্কৃত প্রভাবিত হয়েছে।
তাই মুসলিম শাসনামলে দেখা যায় তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসান। তারাই প্রথম বাংলা সাহিত্যে নর-নারীর প্রেমের রোমান্টিক ভাবধারা নিয়ে আসে, শাহ মোঃ সগিরের ইউসুফ-জুলেখা তার একটি উদাহরন। সেই সময় গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ কৃত্তিবাসকে বাংলায় রামায়ন লেখার নির্দেশ দেন। এছাড়াও বৃহস্পতি মিশ্র বা রায়মুকুট ,শ্রী কৃষ্ণবিজয় লেখক মালাধার বসু, পুরাণসর্বস্বের লেখক গোবর্ধন ব্রাক্ষ্মন সহ প্রচুর কবি সাহিত্যিকের স্বর্ণযূগ ছিল সেটি যা বলে আর শেষ করা যাবেনা। ক্যালিগ্রাফি ও মসজিদ বা মন্দিরের গায়ের প্রস্তর ও পোড়ামাটির শীলালিপিও চরম উৎকর্ষতা লাভ করে সে সময়। এসময়ই বাংলার একত্রীকরণের ফলে বাংলা ভাষা-ভাষী লোক একই রাজ্যের ছায়ায় আশ্রয়গ্রহণ করে ও এর অধিবাসীরা বাঙ্গালী নামে পরিচিতি লাভ করে। স্থাপত্যরীতির উৎকর্ষতাও ছিল শিখরে, সুলতানরা বাগদাদ ও কর্ডোভার আদলে স্থাপত্যশৈলী গড়ে তোলেন। কিন্তু এদেশে পাথরের স্বল্পতার কারনে দূর্গ ও রাজমহল সমূহ পোড়ামাটি তথা ইট দিয়ে তৈরী করা হয়েছিল যা কালের পরিক্রমায় মাটির স্তুপে পরিনত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা বলার আর অপেক্ষা রাখেনা। সে সময় বাংলার সবচেয়ে বড় উৎকর্ষতা হল পর ধর্মের প্রতি সহনশীলতা বজায় রাখা। সুলতানরা ইসলামী ব্যবস্থা কায়েম করলেও তারা নিজেদের হিন্দু প্রজা ও প্রতিষ্ঠান সমুহের পৃষ্ঠপোশক হিসেবে বিবেচনা করতেন। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল এবং কোরান-হাদিস ও পুরানের বিধান সমুহ পাশাপাশি সুসামাঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে কার্যকর ছিল। ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সুফিরা বাংলার সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে ইসলামের সঙ্গে স্থানীয় পুরাকথা ও আচার-আনুষ্ঠানের সংমিশ্রন ঘটান। পীর প্রথা বা মাজার প্রথা এরই একটি উদাহরন। এমনকি এখনো পীর ও মাজার হিন্দু-মুসলমান সকলের কাছে সমান ভাবে পবিত্র। তাই অনেক অমুসলিমদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হবার ব্যাপারটি অপরাপর স্বধর্মীর নিকট বিশেষ কোন ক্ষোভের সঞ্চার করত না। প্রশাসনিক ও সামাজিক সকল ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই অভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হত। তাই সে সময়ের বাংলার ত্রাস বর্গী নামক মারাঠা দস্যু দলেও পেশোয়া রঘুজি ভোঁসলের সাথে মীর হাবিব ও সৈয়দ নুরের তস্কর বর্গীদল দেশে ধ্বংশলীলা চালায়। অপরদিকে বেনারসের শোভা সিং ও রহিম খান সুবাহদার শায়েস্তা খানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করে এবং লুটতরাজ চালায়। এমনকি পলাশির যুদ্ধ সহ সকল প্রকার প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহনকারী প্রত্যেকে তাদের ব্যাক্তি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশদের সাথে হাত মিলিয়েছিল, কোন ধর্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নয়। (চলবে...)
(তথ্যসূত্রঃ বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া)